ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে লালা বন্ধ করার উপায়

ঘুমের মধ্যে লালা পড়া, ছোট কিংবা বড় সবার এ সমস্যা হয়ে থাকে। এ সমস্যাটি আমরা অনেকেই ছোট একটি বিষয় মনে করি। মুখের লালা আমাদের শরীরে বিভিন্ন উপকার করে থাকে, তবে অতিরিক্ত লালা পড়া এটি একটি সমস্যা। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা হতেই থাকলে রোগ দেখা দিতে পারে। তাই আমাদের জানতে হবে। মুখ দিয়ে লালা কেন পড়ে, আর কিভাবে মুখ দিয়ে লালা পড়া বন্ধ করা যায়। আজকের আর্টিকেলে আমরা এসব বিষয়ের তথ্য নিয়ে আলোচনা করবো। যারা এ সমস্যাতে ভুগছেন তারা আজকের আর্টিকেলটি পড়ে সমাধান জেনে নিন।

ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে লালা বন্ধ করার উপায়

মুখ দিয়ে লালা পড়া এ এক অস্বস্তিকর বিষয়। বড়দের মুখ দিয়ে লালা পড়লে অনেক সময় লজ্জার কারন হয়ে দাড়ায়। বিভিন্ন কারনে এ সমস্যা হতে পারে, শরীরে কোনো শারীরিক অসুস্থতার কারনেও হতে পারে। তবে চিন্তার কোনো কারন নেই এ সমস্যার  সমাধান আছে। সমাধান গুলো জেনে আমাদের এ সমস্যা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। চলুন তাহলে জেনে নিই ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে লালা কেন পড়ে এবং কিভাবে মুখ দিয়ে লালা পড়া বন্ধ করা যায়।

মুখ দিয়ে লালা পড়ার কারন

মানুষের মুখ থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় লিটার লালা উৎপন্ন হয়। মুখের মধ্যে থাকা লালাগ্রন্থি, মুখের মধ্যে লালা উৎপন্ন করে। ঘুমের মধ্যে লালা পড়ার বিভিন্ন কারন রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে এখন আমরা জানবো। ঘুমের মধ্যে লালা পড়ার কারনগুলো নিচে আলোচনা করা হলো। 

  • দাঁত দিয়ে নখ কাটার কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। কারন দাঁত দিয়ে নখ কাটলে মুখের তাপমাত্রা কমে যায় এবং এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সৃষ্টি হয়। যার ফলে মুখ দিয়ে লালা পড়ে। তাই মুখ দিয়ে লালা পড়লে এ কাজ কখনই করবেন না।
  • অনেক সময় দাঁতের ফাঁকে খাবার লেগে থাকার কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। তাই প্রতিদিন খাওয়ার পর রাতে ব্রাশ করবেন। 
  • চিকিৎসকেরা বলে থাকেন, পাকস্থলি দূর্বল ও পাকস্থলির ভারসাম্যহীনতার কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। 
  • কারও যদি ঠান্ডা বা সর্দির সমস্যা থাকে তাহলে অনেক সময় মুখ দিয়ে নিশ্বাস নিতে পারে না, মুখ খোলা রেখে নিশ্বাস নেই। ফলে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। 
  • ঘুমের ধরন যদি ঠিক না থাকে, অনেকেই টেবিলে মাথা দিয়ে ঘুমান আবার বালিশে ঠিক করে মাথা দিয়ে ঘুমায় না, উপুর হয়ে ঘুমায়, এগুলোর কারনে মুখ দিয়ে  লালা পড়তে পারে। 
  • কিছু ওষুধ আছে যেগুলো খাওয়ার ফলে শরীরে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া স্বরূপ মুখ দিয়ে লালা পড়ে। 
  • অ্যাসিডিটির সমস্যার কারনে অনেক সময় মুখ দিয়ে লালা পড়ে। 
  • চিকিৎসকেরা বলেন অতিরিক্ত মিষ্টি, গরম অথবা মসলাযুক্ত খাবার খেলে মুখ দিয়ে লালা পড়ে।  
  • প্যালাগ্রা রোগে আক্রান্ত হলে অতিরিক্ত লালা পড়ে। 
  • হজম প্রক্রিয়ার এক ধরনের সমস্যার নাম হলো, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল রিফ্লাক্স ডিসঅর্ডার। এ রোগের কারনে পাকস্থলি থেকে খাবার অন্ননালীতে ফিরে আসে, এতে অন্ন নালীতে ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং খাবার গিলতে সমস্যা হয়। এ  সমস্যার কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়তে দেখা যায়। 
  • স্নায়ু জনিত বিভিন্ন সমস্যার কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। 
  • যারা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে তাদের মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে।
  • কৃমির কারনে মুখ দিয়ে লালা উঠতে পারে।

উপরের মুখ দিয়ে লালা পড়ার কয়েকটি কারন উল্লেখ করেছি তবে, সবার ক্ষেত্রে এই কারনগুলো মিলেনা। শরীরে কোনো রোগ হয়ে থাকলে লক্ষন হিসাবে মুখ দিয় লালা পড়তে পাড়ে। তাই অতিরিক্ত মুখ দিয়ে লালা পড়লে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

আরো পড়ুন: রাতে ঘুমানোর সঠিক সময় কখন - কত ঘন্টা ঘুমানো উচিত

ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে লালা পড়া বন্ধ করার উপায়

ঘুমের মধ্যে বড়দের মুখ দিয়ে লাল পড়া এক বিরক্তি কর বিষয়। অনেক সময় মুখ দিয়ে লালা পড়ার কারনে ঘুমের ব্যঘাত ঘটায়, ফলে আমাদের শরীর অসুস্থ হয়ে যায়। শিশুদের মুখ দিয়ে লালা পড়বে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু বড়দের মুখে লালা পড়া মোটেও স্বাভাবিক নয়। তাই এর সমাধান করা জরুরি। ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে লালা পড়া বন্ধ করার কয়েকটি উপায় নিচে আলোচনা করা হলো-

  • মুখ দিয়ে লালা পড়া দূর করতে ঘুমের অবস্থান ঠিক করুন। উপুড় হয়ে ঘুমালে মুখ দিয়ে লালা পড়ে তাই চিৎ হয়ে  বা পাশ ঘুরে ঘুমানোর অভ্যাস করুন। ঘুমানোর সময় পেটে চাপ অথবা ভর দিয়ে ঘুমাবেন না। 
  • মুখ থেকে লালা পড়া বন্ধ করতে পরিমান মতো পানি পান করুন এবং সাইট্রাস জাতীয় ফল খান। 
  • অতিরিক্ত মিষ্টি ও মসলা জাতীয় খাবার খাওয়া বন্ধ করুন, বিশেষ করে ঘুমানোর আগে। 
  • অনেক সময় আপনার কৃমির সমস্যার কারনেও মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। তাই কৃমির সমস্যার লক্ষন দেখলে কৃমির ওষুধ সেবন করবেন। 
  • আপনার শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে, শ্বাসকষ্ট থেকে নিরাময়ের ওষুধ খান। অনেক সময় শ্বাসকষ্টের কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়ে। 
  • চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে সার্জারি করতে পারেন। এখন মুখের লালা রোধ করতে সার্জারি খুবই কার্যকরি একটি পদ্ধতি। 
  • দাঁত দিয়ে নক কাটার অভ্যাস থাকলে মুখের লালা দূর করতে এই অভ্যাস ঝেড়ে ফেলুন। 
  • অতিরিক্ত ওজন থাকলেও মুখে লালা ঝরে, তাই ওজন কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন। 
  • সকালে ও রাতে খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং ভালো মাউথ ওয়াশ দিয়ে প্রতিদিন তিনবার করে গড়গড়া করুন। তাহলে আপনার মুখ দিয়ে লালা ঝরা বন্ধ হবে। 
  • বেশি উঁচু বালিশ শোয়ার জন্য ব্যবহার করবেন না।

মুখের লালা দূর করতে উপরের বলা সমাধান গুলো করার চেষ্টা করবেন। অতিরিক্ত ঝাল, মিষ্টি খাবেন না, নিয়মিত ব্রাশ করুন, ভিটামিন সি সহ পুষ্টিকর খাবার খান এবং পর্যাপ্ত পরিমানে ঘুমান। এসব করেও যদি সমাধান না পান তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বাচ্চাদের লালা বন্ধ করার উপায়

বাচ্চাদের মুখ দিয়ে লালা পড়া এটা স্বাভাবিক বিষয়, তবে এই স্বাভাবিকের একটা নির্দিষ্ট বয়স আছে। চিকিৎসকের মতে শিশুদের বয়স ৪ বছর হয়ে গেলেও যদি মুখ দিয়ে লালা পড়া বন্ধ না হয়। তাহলে সেটা অস্বাভাবিক হিসেবে ধরা হয়। বাচ্চাদের বিভিন্ন কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। বাচ্চাদের দাঁত উঠলে মুখ দিয়ে লালা বের হয়, বাচ্চারা মুখ খোলা রেখে ঘুমালে, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারনে, কিছু খাবার খাওয়ার কারনে, স্নায়ুর অপরিপক্কতা পভৃতি কারনে শিশুদের মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে। বাচ্চাদের অতিরিক্ত লালা পড়া দেখে মা-বাবারা চিন্তায় পড়ে যান। তবে চিন্তার কিছু নেই এ সমস্যার সমাধান রয়েছে, সেগুলো নিম্বরূপ:

  • অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চাদের মুখে থুথু আসলে বাচ্চারা সেটা গিলতে পারে না, যার কারনে সেটা লালা হিসেবে মুখ দিয়ে বের হয়। এ থেকে সমাধান পেতে একটি ইলেকট্রনিক টুথব্রাশ আপানার বাচ্চার মাড়ি, হালকা করে দিনে দুবার ঘুষোন। এর ফলে বাচ্চারা মুখে থুথু আসলে বুঝতে পারবে এবং থুথু গিলে নিতে শিখে যাবে। 
  • বাচ্চদের ঘুমের ভঙ্গি ঠিক রাখুন, আপনার বাচ্চাকে পেটে ভর দিয়ে ঘুমাতে দিবেন না। পাশ ফিরে বা চিৎ হয়ে শোয়ার অভ্যাস শেখান। 
  • অনেক বাচ্চারা মুখ খোলা রেখে ঘুমানোর অভ্যাস আছে, যার কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়ে। আপনার বাচ্চার এ অভ্যাস থাকলে সেটা পরিবর্তন করুন। বাচ্চার ঠান্ডা জনিত সমস্যা থেকেও মুখ খোলা রেখে ঘুমাতে পারে, সেক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। 
  • অনেক সময় বাচ্চাদের কৃমির সমস্যার কারনে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন এবং কৃমির ওষুধ খাওয়াবেন। 
  • কোনো কিছু চিবাতে দিতে পারেন, এর ফলে লালা ফেলার অভ্যাসটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

উপরের বলা টিপসগুলো বাচ্চার লালা পড়া রোধ করতে সহায়ক হবে। কিন্তু এসব করেও যদি বাচ্চার লালা পড়ে, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরমর্শ নিবেন। কারন অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চাদের শরীরে অভ্যন্তরীন কোনো সমস্য হলে মুখ দিয়ে লালা পড়তে পারে।

আরো পড়ুন: কীভাবে লম্বা হওয়া যায় - লম্বা হওয়ার লক্ষন

মুখে অতিরিক্ত থুথু আসার কারন

মুখে অতিরিক্ত থুথু আমরা না চাইলেও এমনিতেই চলে আসে। মুখে অতিরিক্ত থুথু আসলে  কারও সামনে কথা বলতে গেলে বিব্রতগ্রস্থ হতে হয়। কথা বলতে গেলেই থুথু বেরিয়ে পড়ে যায়। মুখে অতিরিক্ত থুথু আসার বিভিন্ন কারন রয়েছে। চলুন আমরা সেগুলোর সাথে পরিচিত হয়-

  • গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা থেকে আপনার মুখ দিয়ে অতিরিক্ত থুথু বের হয়ে আসতে পারে।
  • কৃমির সমস্যা থেকেও মুখে অতিরিক্ত থুথু আসতে পারে। 
  • আপনার হজমে সমস্যা হলে মুখে অতিরিক্ত থুুথু আসতে পারে। 
  • আপনার শরীরে অতিরিক্ত ওজনের কারনেও মুখে অতিরিক্ত থুথু আসতে পারে। 
  • অতিরিক্ত ধুমপান করলে মুখে থুথু আসতে পারে। 
  • পর্যাপ্ত পরিমানে পানি পান না করলে, শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দেয় ফলে মুখে অতিরিক্ত থুুথু আসতে পারে।
  • মুখে কোনো ভাইরাল ইনফেকশন থাকার কারনে অনেক সময় মুখে অতিরিক্ত থুথু আসে।
  • অনেকের ঠান্ডাজনিত সমস্যার কারনে মুখে থুুথু আসতে পারে। 
  • নিয়মিত মুখ ও দাঁত পরিষ্কার না করার ফলেও মুখে থুথু আসতে পারে।
  • অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার ফলে মুখে থুথু আসতে পারে।

মুখে অতিরিক্ত থুথু আসা বন্ধ করতে - মুখে থুথু আসার কারন খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। এরপর নিয়মিত কৃমির ওষুধ খাবেন, মুখ সবসময় পরিষ্কার রাখবেন, মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকবেন, পর্যাপ্ত পরিমানে পানি পান করবেন। এসব উপায় অবলম্বন করে যদি মুখে থুথু আসা না কমে তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরমর্শ নিবেন।

লেখকের শেষ বক্তব্য

ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে লালা বন্ধ করার উপায় সম্পর্কে আজকের এই ব্লগে সকল তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করি ঘুমের মধ্যে মুখ দিয়ে লালা বন্ধ করার উপায় সম্পর্কে আপনি বিস্তারিত জানতে পেরেছেন।

এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। যদি আপনি এই ধরনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ব্লগ পোস্ট নিয়মিত পড়তে চান তাহলে আপনাকে প্রতিনিয়ত আমাদের এই ওয়েবসাইট ফলো করতে হবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন