অল্প জায়গায় সবজি চাষ - লাভজনক সবজি চাষ

আজকের আর্টিকেলের বিষয় হচ্ছে, অল্প জায়গায় সবজি চাষ-লাভজনক সবজি চাষ। অল্প পরিমাণ জমিতে অনেক ধরনের সবজি ও ফল আবাদ করা যায়। এক জায়গায় দুই বা তারও বেশি চাষ করতে পারবেন । যদি আপনাদের সঠিক নিয়ম জানা থাকে। আমাদের বাড়ির আশেপাশে অনেক ফাঁকা জায়গা থাকে। সঠিক নিয়ম না জানার কারনে আমরা সেখানে কোনো সবজি চাষ করতে পারিনা। সেখানে কীভাবে কোন উপায় অবলম্বন করে সবজি চাষ করা যায় তার সঠিক তথ্য খুজে পায়না।

অল্প জায়গায় সবজি চাষ লাভজনক সবজি চাষ

এর জন্য আমাদের স্থান মূল্যয়ন, সূর্যলোক, বাতাসের ধরন, উপযুক্ত সবজি নির্বাচন, মাটি প্রস্তুত করণ, কোন জায়গায় কী সবজির ফলন ভালো হয় সেসব বিষয় জানা দরকার। অল্প জমিতে সবজি চাষ করতে চাইলে টিপসগুলো অনুসরন করুন।

অল্প জায়গায় বেশি সবজি চাষের উপায় 

অল্প জায়গায় সবজি চাষ করতে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। সবজি চাষে প্রচুর মনোযোগি হয়ে পরিচর্যা করতে হয়। সঠিক নিয়মে আবাদ করলে অল্প  জায়গায় বেশি সবজি চাষ করা যায়। কোন কোন সময়ে  কোন ধরনের  সবজির ফলন ভালো হয় সে বিষয়ে জ্ঞান থাকা জরুরি। একেক অঞ্চলে একেক ধরনের শাকসবজি উৎপাদিত হয়। বৈজ্ঞানিক উপায়ে সবজি চাষ করলে অল্প জায়গায় বেশি সবজি চাষ করা যায়। সবজি চাষের জন্য উঁচু স্থান বেশি উপযোগি। প্রয়োজনমতো জমির আকার বুঝে সবজি চাষ করা জরুরি। সবজি চাষের জন্য নিচের টিপসগুলো আপনাকে লক্ষ্য রাখা জরুরি।

পানি সেচ: সবজির জাত দেখে পানি সেচ  দিতে হবে। 

আগাছা দমন: সবজি চাষে আগাছা দমন করতে হবে । কারণ আগাছা থাকার কারণে  সবজি ফসল বাড়তে ব্যঘাত ঘটে। নিয়মিত আলো বাতাস পায়না। জমিতে আগাছা থাকলে সেখানে রোগ পোকামাকড় জন্ম নেয় এতে সবজি চাষ ভালো হয় না।

সার প্রয়োগ: সবজি চাষের জন্যে প্রচুর পরিমানে সার প্রয়োগ করতে হয়। সকল গাছে একইভাবে সার প্রয়োগ করা যাবেনা। মাটি পরীক্ষা করে ফসলে সার দিতে হবে। প্রথম কিস্তিতে চারা লাগানোর ১৫-২০ দিন পর এবং দ্বিতীয় কিস্তিতে গাছে ফল আসার পূর্বে মাটির সাথে মিশিয়ে সার দিতে হয়।

পরাগায়ন: পরাগায়নের মাধ্যমে ফল আসে। তাই প্রাকৃতিক এবং কৃত্রিম উপায়ে পরাগায়নের  ব্যবস্থা করতে হবে। প্রাকৃতিক পরাগায়ন ঘটাতে প্রজাপতি,মৌমাছি,বোলতা এসব পতঙ্গ আসার ব্যাবস্থা করতে হবে।

রোগ ও পোকামাকড় দমন: সবজি ফসলে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকামাকড়  জন্ম নেয়। সবজি ফসলে ছত্রাকজনিত গোড়া পঁচা , ঢলে পড়া, ফল পঁচা আর ভাইরাসজনিত মোজাইক রোগ হয়। সবজি ফসলে জাবপোকা, উইপোকা, লেদা পোকা, পাত খেকো পোকা, ফল ছিদ্র পোকা বাসা বাধে। এসব পোকা দমনের জন্যে নির্ধারিত সময়ে সঠিক কীটনাশক ব্যবহার করা জরুরি।

ফসল সংগ্রহ: সবজি চাষের একটি গুরত্বপূর্ন বিষয় হলো ফল সংগ্রহ। ফসল পরিপক্ক অথবা খাওয়ার উপযোগি হলে ফসল সংগ্রহ করতে হয়। টাটকা বাজারজাত করতে হবে, তাহলে সবজি চাষে লাভজনক হওয়া যায়।   

শাকসবজি চাষে সফলতা পেতে উপরের টিপসগুলো ব্যবহার করে সঠিকভাবে শাক-সবজির পরিচর্যা করতে হবে।

ছায়ার মধ্যে কি কি সবজি চাষ করা যায়

আপনার বাড়ির আশেপাশে অনেক ফাঁকা জায়গা আছে যেখানে সূর্যের আলো পৌছায় না। ২ থেকে ৩ ঘন্টা রোদ পড়ে এমন স্থানকে ছায়াযুক্ত স্থান বলা হয়। আমরা অনেকেই ভেবে থাকি ছায়াযুক্ত স্থানে সবজি অথবা ফল চাষ করা যায় না। তবে এটি ভুল ধারনা। ছায়াযুক্ত স্থানে বিভিন্ন ধরনের ফল ও শাকসবজি চাষ করা যায়। ছায়াযুক্ত স্থানে আমরা শাকজাতীয় ফসল, সবজি জাতীয় ফসল, মসলা জাতীয় ফসল, ফল জাতীয় ফসল উৎপাদন করতে পারবো যদি আমাদের সঠিক নিয়ম জানা থাকে। তবে একেবারেই রোদ পায়না এমন স্থানে সবজি চাষ না করায় ভালো,  এতে তেমন লাভজনক হওয়া যায় না। 

শাকজাতীয় ফসল: শাকজাতীয় ফসলের মধ্যে কলমি শাক, কচু শাক, লেটুস, মিষ্টি আলু শাক পুরোপুরি ছায়াযুক্ত স্থানে চাষ করা যায়। তবে যদি ২-৩ ঘন্টা সূর্যের আলো পায় তাহলে ভালো মানের  লাল শাক, পুঁই শাক, পালংশাক, পুদিনা, ডাটা শাক ও লাউ শাকের চাষ করা যায়। 

সবজি জাতীয় ফসল: ছায়া যুক্ত স্থানে শিম একটি গুরত্বপূর্ন সবজি। এছারাও টমেটো, ওলকচু, মানকচু এসব সবজি লাগানো যায়।

ফল জাতীয় ফসল: কুল গাছ, আতা, তেঁতুল, আপেল, কামরাঙ্গা আনারস এসব গাছ ছায়াযুক্ত স্থানে চাষ করা যায়। 

মসলা জাতীয় ফসল: আদা, হলুদ, তুলসি, পান, এলাচ চাষ করা যায়।

পুকুরপাড়ে কি কি সবজি চাষ করা যায়

পুকুর পাড়ে যেসব সবজি চাষ করে আমরা লাভজনক হয় সেসব সবজির নাম আপনাদের সামনে তুলে ধরব। পুকুর পাড়টিকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করে সবজি চাষ করা যায়। পুকুরের পাড়গুলো পতিত না রেখে আমরা বিভিন্ন ধরনের  সবজি চাষ করতে পারবো। পুকুর পাড়ে বারোমাসি অনেক সবজি চাষ করা যায়। পুকুর পাড়ের জমি কৃষকের বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আমাদের কৃষি প্রধান দেশে পুকুরে মাছ চাষ তার পাড়ে সবজি চাষ করে কৃষকের আর্থিক অবস্থা সচল থাকছে।

পুকুরে ছোট, বড় মাঝারি সব ধরনের ফসল চাষ করা যায়। বিভিন্ন জাতির শাক পুইশাক, পালংশাক, কচুশাক চাষ করা যায়। পকুরে কলা গাছ, পেঁপে গাছ, সজনে গাছ লাগানো যায়। এছারাও পুকুরপাড়ে লাউ, পটল, কুমরা , চিচিংগা ইত্যাদি চাষ করা যায়। পুকুর পাড় উঁচু থাকার কারনে সকল ধরনের সবজি চাষ ভালো হয়। পুকুরকে এবং পুকুরের পাড়কে কাজে লাগিয়ে আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে অনেক কৃষক অধিক হারে মুনাফা অর্জন করছে।

সবচেয়ে লাভজনক সবজি চাষ কোনটি

কৃষিপ্রধান দেশে কৃষকেরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে চলেছে কীভাবে সবজি চাষ করে অধিক হারে মুনাফা অর্জন করা যায়। কৃষকের উচিত এমন সবজি রোপন করা, যার চাহিদা তুলনামূলক ভাবে বেশি এবং সারাবছরেয় এই চাহিদা থাকে। আমরা এখানে সেই সব সবজির কথা বলছি যা চাষ করলে কৃষক সবচেয়ে বেশি লাভজনক হয়।

চেরি টমেটো: চেরি টমেটো স্বাস্থের জন্য খুবই উপকারি। এর দাম বাজারে তুলনামূলক ভাবে বেশি। এ সবজির চাহিদাও বেশি।

জুচিনি চাষ: ওজন কমাতে এ সবজি খাওয়া হয়। বাজারে এ সবজির চাহিদা বেশি। 

মাশরুম চাষ: মাশরুম চাষ করেও লাভজনক হওয়া যায়। 

এ সবজি গুলোর দাম তুলনামূলক ভাবে বেশি। যে ফলে লাভ বেশি সে ফল চাষ করে লাভজনক হওয়া যায়। আবার যে ফলের ফলন বেশি সে ফল চাষ করে লাভজনক হওয়া যায়। লিচু আপেলে ফলন বেশি হয়, ফলে মুনাফা অর্জন বেশি হয়। এছারাও কিছু কম দামি সবজি রয়েছে যেগুলো চাষে অসময়ে অনেক মুনাফা অর্জন করা যায়। ঢেঁড়স, বেগুন, করলা, পটল, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়ো ইত্যাদি।

বারোমাসি সবজি চাষ

বারোমাসে সবজি চাষ করতে হলে। আমাদের জানতে হবে কোন মাসে কোন ধরনের সবজি চাষ করতে হয়। 

জানুয়ারি: জানুয়ারি মাসে লালশাক, ধনেপাতা,পালংশাক, করলা, পটল, টমেটো , বেগুন চাষ করা হয়।

ফেব্রুয়ারি: শশা, করলা, লাল শাক, পুঁইশাক, ঢ়েড়স, বেগুন,ধনে পাতা, বরবটি চাষ করা যায় ।

মার্চ: বেগুন, শশা, বরবটি, চালকুমড়ো,লাউ, করলা, ঢ়েড়স চাষ করা যায়।

এপ্রিল: শশা, পেঁপে, মরিচ, তরমুজ, বরবটি, ধুন্দল, ঝিঙে, চিচিঙ্গা  ইত্যাদি।

মে: কলমি শাক, ডাটা শাক, মুলা শাক, বরবটি, মরিচ, ঝিঙে মে মাসে ফলন ভালো হয়।

জুন: বেগুন, কচু, শিম, মরিচ, সজিনা, কুমড়ো, বরবটি এ মাসে চাষ করা যায়।

জুলাই: বেগুন, শশা, কচু, চাল কুমড়ো, পেঁপে, টমেটো জুলাই মাসের ফসল।

আগষ্ট: ক্যাপসিকাম, ঢ়েঁড়স, বরবটি, লাউ, বেগুন, মরিচ চাষ করা যায়।

সেপ্টেম্বর: শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, টমেটো, লাউ চাষ করা হয়।

অক্টোবর: মুলা, ফুলকপি, বাধাকপি, বেগুন, টমেটো, মটরশুঁটি, ব্রোকলি, শিম এ মাসে চাষ করা হয়।

নভেম্বর: ক্যাপসিকাম,ফুলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, ওলকপি, মরিচ, বেগুন চাষ করা যায়। 

ডিসেম্বর: শশা, কচু, শিম, বরবটি, লাউ, বেগুন, চাল কুমড়ো, টমেটো, পুঁইশাক, লালশাক, গাজর চাষ করা যায়।

গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ

গ্রীস্মকালে যেসব সবজি চাষ করবেন তা হলো-শশা, পুঁইশাক, করলা, ঢ়েড়স, লাউ, কুমড়ো, পটল, ঝিঙে, কাঁকরোল, লাল আলু, মরিচ, বেগুন ইত্যাদি। এসকল সবজি  সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। এসব গ্রীষ্মকালীন সবজিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক , ভিটামিন এ সহ নানান উপাদান থাকে। যা শরীরকে সুস্থ রাখতে বেশ কার্যকর।

শীতকালে যেগুলো চাষ করবেন: ফুলকপি, বাঁধাকপি, কুমড়া, মুুলা, শিম, টমেটো, বরবটি, ধুন্দল, বেগুন।

বেশ কিছু নিয়ম ফলো করে সবজি চাষ করবেন। কিছু সবজি দেরিতে সংগ্রহ করলে গুনগত মান নষ্ট হয়ে যায় আবার বেশি কচি অবস্থায় সংগ্রহ করলে ফলন কমে যায়। শীতকালীন শাকসবজি গ্রহন করে নিজেকে  সুস্থ রাখা যায়।

টবে বারোমাসি সবজি চাষ

অনেকের ইচ্ছা থাকে বাড়ির ছাদে টবে গাছ লাগানো। টবে বারোমাসি বিভিন্ন ধরনের  গাছ লাগানো যায়। খুব সহজেই টবে ফলানো যায় এমন কয়েকটি সবজি হলো- ক্যাপসিকাম, শশা, লেবু, টমেটো, বেগুন , মরিচ, মটরশুঁটি, লেটুস।

সঠিকভাবে  বীজ বপন, পরিচর্যা, সঠিক সময়ে সবজি সংগ্রহ এসব নিয়ম মানলে অল্প জায়গায় সবজি চাষ করে লাভজনক হওয়া যায়। অল্প জায়গায় জমি চাষ করতে, উপরের টিপসগুলো ফলো করুন।

লেখকের শেষ বক্তব্য

অল্প জায়গায় সবজি চাষ - লাভজনক সবজি চাষ সম্পর্কে আজকের এই ব্লগে সকল তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করি অল্প জায়গায় সবজি চাষ - লাভজনক সবজি চাষ সম্পর্কে আপনি বিস্তারিত জানতে পেরেছেন।

এতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। যদি আপনি এই ধরনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ব্লগ পোস্ট নিয়মিত পড়তে চান তাহলে আপনাকে প্রতিনিয়ত আমাদের এই ওয়েবসাইট ফলো করতে হবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন